ফিচ রেটিংসের পূর্বাভাস

বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমছে, শ্লথ হচ্ছে মার্কিন অর্থনীতি

বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে পূর্বাভাস সংশোধন করেছে ঋণমান সংস্থা ফিচ রেটিংস।

বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে পূর্বাভাস সংশোধন করেছে ঋণমান সংস্থা ফিচ রেটিংস। সংশোধন করে পূর্বাভাস বাড়ালেও নিউইয়র্কভিত্তিক সংস্থাটির হিসাবে, বিশ্বব্যাপী চলতি ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে প্রবৃদ্ধির হার অর্জন হবে ২০২৪ সালের তুলনায় কম। একই সঙ্গে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধির গতিও শ্লথ হয়ে আসছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

ঋণমান সংস্থাটির সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুসারে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চলতি বছর সম্প্রসারণের হার দাঁড়াতে পারে ২ দশমিক ৪ শতাংশে। জুনে দেয়া এক পূর্বাভাসে তা ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছিল ফিচ রেটিংস। এর আগে ২০২৪ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ।

সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনীতির এ শ্লথগতি বজায় থাকবে ২০২৬ সালেও। ওই সময় বিশ্বব্যাপী জিডিপি প্রবৃদ্ধির মোট হার দাঁড়াতে পারে ২ দশমিক ৩ শতাংশে। তবে ২০২৭ সালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা যেতে পারে। ওই বছর বৈশ্বিক অর্থনীতির সম্প্রসারণের হার দাঁড়াতে পারে ২ দশমিক ৬ শতাংশে।

চলতি বছর বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি পুনরুদ্ধারের পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত শুল্কনীতিকে দায়ী করছে ফিচ রেটিংস। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন দফায় দফায় শুল্ক হ্রাস-বৃদ্ধির নীতি গ্রহণ করায় বেশ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এ অনিশ্চয়তা কিছুটা কমেছে।

এ শুল্ক বাধা এখন বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর দেয়া জিডিপি পূর্বাভাসের অন্যতম প্রভাবক। ফিচের প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্রায়ান কুলটন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কতটা শুল্ক বাড়াবে, তা নিয়ে স্পষ্টতা এলেও এ সত্য বদলায় না যে শুল্ক বাড়ানোর হার বেশ বড় এবং এটি বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমাবে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির শ্লথগতির প্রমাণ এখন আর শুধু জরিপে নয়, বরং বাস্তব তথ্যেও ধরা পড়ছে।’

ফিচের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের গড় কার্যকর শুল্কহার (ইটিআর) এখন ১৬ শতাংশ, যা জুনে পূর্বাভাসকৃত হারের কাছাকাছি।

বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র এ সময় শ্লথতার মধ্য দিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ফিচ। সংস্থাটি বলছে, সরাসরি গণনা ও যাচাইযোগ্য তথ্যে (হার্ড ইকোনমিক ডাটা) মার্কিন অর্থনীতির গতি ধীর হয়ে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দেশটিতে চলতি বছর প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে ১ দশমিক ৬ শতাংশে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ঘোষণার শুরু থেকেই দেশটিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফিচ রেটিংসের ভাষ্যমতে, আমদানীকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি এখন পর্যন্ত মধ্যম মাত্রায় রয়েছে। তবে তা চলতি বছরের শেষ নাগাদ দ্রুত বাড়তে পারে। এছাড়া উচ্চমূল্যস্ফীতি প্রকৃত মজুরির হারকে কমিয়ে দেবে এবং মার্কিন ভোক্তা ব্যয়কে চাপের মুখে ফেলবে, যা এরই মধ্যে ধীর হতে শুরু করেছে।

ফিচ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে বাজেট ঘাটতি ২০২৬ সালেও এর ক্রমবর্ধমান ধারাটি বজায় রাখবে। এ সময়ের জন্য পূর্বাভাসকৃত ১ দশমিক ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি মার্কিন অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার তুলনায় বেশ কম।

ফিচের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি এখন উল্লেখযোগ্যভাবে ধীরগতির। শ্রমবাজারের এ দুর্বলতার কারণে ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুতগতিতে সুদহার কমাতে বাধ্য হতে পারে। এক্ষেত্রে চলতি মাস ও ডিসেম্বরে ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে সুদহার কমাতে পারে ফেড। ২০২৬ সালে সুদহারে আরো তিনটি কাটছাঁট আসতে পারে।

ফিচের ভাষ্যমতে, চলতি জানুয়ারি-জুনে ডলারের বিনিময় হারে ব্যাপক অবমূল্যায়ন দেখা গেলেও সে পরিস্থিতি থেকে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা আপাতত সীমিত।

পূর্বাভাস অনুসারে, চলতি বছর চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এর আগে জুনে দেয়া পূর্বাভাসে ফিচ বলেছিল, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির চলতি বছরে সম্প্রসারণের হার দাঁড়াতে পারে ৪ দশমিক ২ শতাংশে।

বর্তমানে মার্কিন শুল্কনীতির অন্যতম লক্ষ্য চীন। শুরুতে দেশটি থেকে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর ১৪৫ শতাংশ হারে শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখন বাণিজ্য আলোচনাসংক্রান্ত বিরতির মধ্যে গড়ে ৩০ শতাংশ হারে শুল্ক কার্যকর রয়েছে।

ফিচের পর্যবেক্ষণ বলছে, শুল্কচাপ থাকা সত্ত্বেও চীনের রফতানি প্রবৃদ্ধি ভালো অবস্থায় আছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হারে হ্রাস, রফতানি পণ্যের দাম কমে যাওয়া এবং রফতানি বাজারের পুনর্বিন্যাস। এছাড়া দেশটির সরকারের আর্থিক প্রণোদনা প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে সহায়তা করছে। তবে বেসরকারি খাতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ধীর হচ্ছে এবং মূল্যসংকোচন ক্রমেই বাড়ছে।

অন্যদিকে ইউরোজোনের রফতানি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও সে গতি টেকসই হয়নি। অঞ্চলটিতে ভোক্তা ব্যয় পুনরুদ্ধারের গতিও ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তাই বছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা করছে না ফিচ। তবে জার্মানির আর্থিক প্রণোদনা আগামী বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা সহায়তা দেবে। ফিচ রেটিংস চলতি বছরে ইউরোজোনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দশমিক ৮ থেকে সংশোধন করে ১ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত করেছে।

ফেডের পথ অনুসরণ করে চলতি বছর ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্ভাবনা কম বলেও মনে করছে ফিচ।

প্রতিবেদনে আর্থিক বাজার সম্পর্কে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও জাপানে ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ডে ঊর্ধ্বমুখী চাপ দেখা যাচ্ছে। বাজারে যথেষ্ট পরিমাণে বন্ড ছাড়া নিয়ে অনিশ্চয়তা এক্ষেত্রে বড় প্রভাবক হয়ে উঠতে পারে।

আরও